বিদেশ থেকে সোনা আমদানিতে কিভাবে এবং কত টাকা শুল্ক আরোপ করা হয়?

বিদেশ থেকে সোনা আমদানিতে কিভাবে এবং কত টাকা শুল্ক আরোপ করা হয়?

বিদেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরার সময় অনেকেই সোনা নিয়ে আসেন। কেউ নিজের ব্যবহারের জন্য গহনা কেনেন, কেউ আবার সোনার বার আনতে চান। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, সৌদি আরব, দুবাই বা অন্যান্য দেশ থেকে দেশে ফেরার সময় সোনা আনার বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বেশ বেশি। কিন্তু সোনা আনার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা খুব জরুরি—বিদেশ থেকে সোনা আনা আর সাধারণ কোনো পণ্য দেশে আনা এক বিষয় নয়। এর জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম, সীমা, ঘোষণা এবং কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, বিদেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সোনা সঙ্গে আনলেই শুধু বিমানবন্দরে শুল্ক দিয়ে বের হয়ে যাওয়া যায়। বাস্তবে বিষয়টি নির্ভর করে আপনি সোনার গহনা আনছেন নাকি সোনার বার/পিণ্ড আনছেন, কত ওজন আনছেন এবং সেটি ব্যক্তিগত যাত্রী ব্যাগেজের আওতায় পড়ছে নাকি বাণিজ্যিক আমদানির আওতায় পড়ছে তার ওপর।

বর্তমান যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী নির্দিষ্ট শর্তে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনার অলংকার শুল্ক-কর ছাড়াই আনতে পারেন। অন্যদিকে সোনার বার বা গোল্ড বার আনলে সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি পর্যন্ত নির্দিষ্ট হারে শুল্ক দিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম বা ১ ভরি সোনার বারের জন্য শুল্ক ৫,০০০ টাকা।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। একজন সাধারণ যাত্রী যে নিয়মে সোনা আনতে পারেন, কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করলে সেই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে সোনার ধরন, HS Code এবং প্রযোজ্য কাস্টমস ট্যারিফ অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করা হয়।

বিদেশ থেকে সোনা আমদানিতে কিভাবে এবং কত টাকা শুল্ক আরোপ করা হয়?

যদি আপনি একজন যাত্রী হিসেবে বিদেশ থেকে সোনার বার বা সোনার পিণ্ড বাংলাদেশে আনেন, তাহলে বর্তমান বিমানবন্দর কাস্টমসের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম বা ১ ভরিতে ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি পর্যন্ত এই সুবিধা রয়েছে এবং একজন যাত্রী বছরে একবার এই সুবিধা নিতে পারেন।

সহজ করে বললে, আপনি যদি ১ ভরি সোনার বার আনেন, তাহলে শুল্ক হবে ৫,০০০ টাকা। ৫ ভরি হলে ২৫,০০০ টাকা এবং ১০ ভরি হলে ৫০,০০০ টাকা।

১০ ভরি সোনা প্রায় ১১৭ গ্রামের সমান। তাই সর্বোচ্চ অনুমোদিত পরিমাণ অর্থাৎ ১১৭ গ্রাম সোনার বার আনলে মোট শুল্ক প্রায় ৫০,০০০ টাকা হয়। বিমানবন্দর কাস্টমসের প্রকাশিত নির্দেশনাতেও ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনার জন্য প্রায় ৫০,০০০ টাকা শুল্কের কথা উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই হিসাবটি শুধু যাত্রী ব্যাগেজে অনুমোদিত সোনার বার-এর জন্য। বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা সোনার ক্ষেত্রে এই ৫,০০০ টাকা প্রতি ভরি নিয়ম ধরে হিসাব করা যাবে না।

১০০ গ্রাম সোনার গহনা কি শুল্কমুক্ত?

বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় একজন যাত্রী নির্দিষ্ট শর্তে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনার অলংকার শুল্ক ও কর ছাড়াই আনতে পারেন। বিমানবন্দর কাস্টমসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী একই ধরনের অলংকার ১২টির বেশি হওয়া যাবে না।

অর্থাৎ কেউ যদি বিদেশ থেকে নিজের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সীমার মধ্যে সোনার গহনা নিয়ে আসেন, তাহলে সেটির জন্য সোনার বারের মতো প্রতি ভরি ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয় না।

এখানে একটি বিষয় অনেকেই ভুল করেন। ১০০ গ্রাম গহনার শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং ১১৭ গ্রাম সোনার বারের শুল্ক প্রদানের সুবিধা আলাদা। দুটি নিয়মকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক নয়।

২০২৫ সালের নতুন অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালার তথ্য NBR-এর নিজস্ব তথ্যভাণ্ডারেও তালিকাভুক্ত রয়েছে।

সোনার বার আনতে হলে কী করতে হবে?

বিদেশ থেকে সোনার বার নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেটি কাস্টমসের কাছে ঘোষণা করা। সোনার বার সঙ্গে রেখে ঘোষণা না করে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করা আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বর্তমান কাস্টমস নির্দেশনায় বলা হয়েছে, একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনা ঘোষণা করে নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে আনতে পারেন। এই সুবিধা বছরে একবারের জন্য প্রযোজ্য।

অন্যদিকে ১১৭ গ্রামের বেশি সোনা যাত্রী ব্যাগেজের এই নির্দিষ্ট সুবিধার মধ্যে পড়ে না। কাস্টমসের নির্দেশনায় সীমার অতিরিক্ত সোনা আটক বা জব্দ করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘোষণা ছাড়া সোনার বার বা সোনার পিণ্ড বহন করাকে অবৈধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই বিদেশ থেকে সোনা আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো আগে থেকেই নিয়ম জানা এবং বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় ঘোষণা ও শুল্ক পরিশোধের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।

১ ভরি সোনার জন্য কত টাকা শুল্ক?

বাংলাদেশের প্রচলিত হিসাবে ১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম। বর্তমান যাত্রী ব্যাগেজ নিয়ম অনুযায়ী সোনার বারের জন্য প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম বা ১ ভরিতে ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। তাহলে হিসাবটা খুব সহজ।

১ ভরি = ৫,০০০ টাকা শুল্ক; ২ ভরি = ১০,০০০ টাকা; ৫ ভরি = ২৫,০০০ টাকা; ১০ ভরি = ৫০,০০০ টাকা।

তবে এই হিসাব করার সময় মনে রাখতে হবে, এটি যাত্রী ব্যাগেজে নির্ধারিত সীমার মধ্যে সোনার বার আনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ব্যবসায়িক আমদানির ক্ষেত্রে আলাদা কাস্টমস ট্যারিফ প্রযোজ্য হয়।

বিদেশ থেকে সোনার গহনা এবং সোনার বারের নিয়ম কি একই?

না, দুটি সম্পূর্ণ একই নিয়মের আওতায় পড়ে না। সোনার গহনার ক্ষেত্রে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক-করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে সোনার বারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি পর্যন্ত নির্ধারিত শুল্ক দিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ধরুন, একজন যাত্রী বিদেশ থেকে একটি সোনার নেকলেস আনলেন। সেটি যদি নির্ধারিত ১০০ গ্রামের সীমার মধ্যে থাকে এবং অন্যান্য শর্ত পূরণ করে, তাহলে সেটি শুল্কমুক্ত সুবিধার মধ্যে পড়তে পারে। কিন্তু একই ওজনের সোনা যদি বার আকারে আনা হয়, তাহলে সেটির ওপর নির্ধারিত শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

অর্থাৎ শুধু “কত গ্রাম সোনা” সেটিই একমাত্র বিষয় নয়। সোনাটি কী আকারে আনা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাণিজ্যিকভাবে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করলে কী হয়?

এবার আসা যাক ব্যবসায়িক আমদানির বিষয়ে। কোনো ব্যবসায়ী যদি বিদেশ থেকে সোনা এনে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে চান, তাহলে যাত্রী ব্যাগেজের ৫,০০০ টাকা প্রতি ভরি শুল্কের নিয়ম তার জন্য প্রযোজ্য নয়।

বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের ধরন অনুযায়ী HS Code নির্ধারণ করা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট Customs Tariff অনুযায়ী শুল্ক ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর হিসাব করা হয়।

NBR-এর ২০২৫-২০২৬ Bangladesh Customs Tariff-এ Gold-এর জন্য Chapter 71-এর অধীনে 7108 heading ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে Gold powder, Gold Dore, Unwrought Gold, Semi-Manufactured Gold এবং Monetary Gold-এর জন্য আলাদা HS Code রয়েছে।

এই কারণে ব্যবসায়িক আমদানিকারকের ক্ষেত্রে “সোনার শুল্ক কত?”—এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কোন ধরনের সোনা আমদানি করা হচ্ছে।

বাণিজ্যিক আমদানিতে Unwrought Gold-এর শুল্ক কত?

NBR-এর প্রকাশিত ২০২৫-২০২৬ Customs Tariff অনুযায়ী HS Code 7108.12.90-এর অধীনে non-monetary unwrought gold-এর Customs Duty প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ২,০০০ টাকা দেখানো হয়েছে। একইভাবে HS Code 7108.13.00-এর semi-manufactured gold-এর ক্ষেত্রেও প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ২,০০০ টাকা Customs Duty উল্লেখ রয়েছে। ওই ট্যারিফ টেবিলে এসব কোডের VAT শূন্য দেখানো হয়েছে।

এখানে আবারও বলা প্রয়োজন, এই হার বাণিজ্যিক আমদানির নির্দিষ্ট HS Code-এর জন্য। এটি যাত্রী হিসেবে বিমানবন্দরে একটি সোনার বার নিয়ে আসার ৫,০০০ টাকা প্রতি ভরি শুল্কের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

এই পার্থক্যটি অনেক অনলাইন আর্টিকেলে পরিষ্কারভাবে বলা হয় না। ফলে পাঠক মনে করতে পারেন, বিদেশ থেকে যেকোনো ধরনের সোনা আনলেই হয় ২,০০০ টাকা নয়তো ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হবে। আসলে বিষয়টি এত সরল নয়।

Gold Dore-এর ক্ষেত্রে শুল্ক আলাদা

Gold Dore-ও সোনার একটি নির্দিষ্ট form। Customs Tariff-এ এটি HS Code 7108.12.10 হিসেবে আলাদা করে দেখানো হয়েছে।

NBR-এর প্রকাশিত ট্যারিফ অনুযায়ী Gold Dore-এর ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ Customs Duty দেখানো হয়েছে। একই টেবিলে VAT শূন্য দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ একই Chapter-এর মধ্যে থাকা বিভিন্ন ধরনের সোনার জন্যও শুল্কের পদ্ধতি এক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট টাকার অঙ্ক প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে, আবার কোথাও শতাংশভিত্তিক Customs Duty নির্ধারিত।

এ কারণেই ব্যবসায়িকভাবে সোনা আমদানির আগে শুধু সোনার বর্তমান বাজারদর জানলেই হবে না। পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস এবং HS Code জানা প্রয়োজন।

HS Code কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

অনেক সাধারণ পাঠকের কাছে HS Code বিষয়টি কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। সহজভাবে বললে, এটি পণ্যকে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে চিহ্নিত করার একটি আন্তর্জাতিক পদ্ধতি। কাস্টমস এই শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে আমদানি করা পণ্যের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক নির্ধারণ করে।

সোনার ক্ষেত্রে bar, unwrought gold, gold dore, semi-manufactured gold এবং jewellery একই জিনিস হিসেবে গণ্য হয় না। এগুলোর আলাদা classification থাকতে পারে।

তাই একজন ব্যবসায়ী যদি ভুলভাবে পণ্যের HS Code ঘোষণা করেন, তাহলে শুল্ক হিসাব বা customs clearance-এ জটিলতা তৈরি হতে পারে। উচ্চমূল্যের পণ্য হওয়ায় সোনার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

বিদেশ থেকে সোনা এনে বিমানবন্দরে কীভাবে ঘোষণা করবেন?

বাংলাদেশে আসার পর যাত্রীর ব্যাগেজের সঙ্গে থাকা শুল্কযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস declaration-এর ব্যবস্থা রয়েছে। NBR-এর ব্যাগেজ বিধিমালায় declaration form-এর কথাও উল্লেখ আছে। আপনার কাছে যদি শুল্কযোগ্য সোনার বার থাকে, তাহলে কাস্টমসকে সেটি জানাতে হবে। প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুল্ক নির্ধারণ করবে এবং নির্ধারিত অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে পণ্য ছাড় করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সোনা লুকিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করা। কাস্টমসের বর্তমান নির্দেশনায় ঘোষণা ছাড়া gold bar বা gold ingot বহনের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনা আনলে মোট কত টাকা লাগবে?

যদি আপনি যাত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ অনুমোদিত ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনার বার আনেন, তাহলে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ৫,০০০ টাকা হিসাবে মোট শুল্ক হবে প্রায় ৫০,০০০ টাকা। বিমানবন্দর কাস্টমসের বর্তমান নির্দেশনাতেও এই হিসাব দেওয়া হয়েছে। তবে এখানে “সোনার দাম” এবং “সোনার শুল্ক”—দুটিকে আলাদা করে দেখতে হবে।

ধরুন, বিদেশে আপনি একটি সোনার বার কিনেছেন। সেই সোনার বাজারমূল্য এক বিষয়, আর বাংলাদেশে সেটি আনতে প্রযোজ্য কাস্টমস শুল্ক আরেক বিষয়। ৫০,০০০ টাকা হলো নির্ধারিত শুল্কের হিসাব; এটি সোনার ক্রয়মূল্য নয়।

এই পার্থক্যটি বোঝা থাকলে বিদেশ থেকে সোনা আনার মোট খরচ হিসাব করা অনেক সহজ হয়।

বছরে কতবার সোনার বার আনা যায়?

বর্তমান বিমানবন্দর কাস্টমস নির্দেশনা অনুযায়ী একজন যাত্রী বছরে একবার সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনার বার নির্ধারিত শুল্ক দিয়ে আনতে পারেন। অর্থাৎ কেউ যদি মনে করেন, প্রতি বিদেশ সফরে ১০ ভরি করে সোনার বার এনে একই সুবিধা ব্যবহার করা যাবে, তাহলে সেটি সঠিক ধারণা নয়।

তাই যারা নিয়মিত বিদেশ যাতায়াত করেন, তাদেরও প্রতিবার সোনা আনার আগে বর্তমান বিধিমালা যাচাই করা উচিত।

সীমার বেশি সোনা আনলে কী হতে পারে?

যাত্রী ব্যাগেজের নির্ধারিত সীমার বাইরে সোনা নিয়ে আসার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দর কাস্টমসের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ১১৭ গ্রামের বেশি সোনা নির্ধারিত যাত্রী সুবিধার মধ্যে পড়ে না এবং অতিরিক্ত সোনা আটক বা জব্দ হতে পারে। ঘোষণা ছাড়া সোনার বার বহনের ক্ষেত্রেও কাস্টমস কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।

তাই “আরও একটু বেশি আনলে হয়তো সমস্যা হবে না”—এ ধরনের ধারণার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

সোনা যেহেতু উচ্চমূল্যের পণ্য এবং এর আমদানি নিয়ন্ত্রিত, তাই দেশে ফেরার আগে নিজের বহন করা সোনার পরিমাণ, ধরন এবং প্রযোজ্য নিয়ম পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

বিদেশ থেকে সোনা আনতে গিয়ে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি মনে রাখতে হবে?

বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় যদি সোনার গহনা থাকে, তাহলে প্রথমেই তার ওজন যাচাই করা ভালো। ১০০ গ্রামের মধ্যে আছে কি না, একই ধরনের গহনার সংখ্যা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে কি না—এসব বিষয় দেখতে হবে। আর যদি সোনার বার থাকে, তাহলে সেটির ওজন ১১৭ গ্রামের মধ্যে কি না এবং প্রতি ভরি ৫,০০০ টাকা হারে প্রয়োজনীয় শুল্ক দেওয়ার প্রস্তুতি আছে কি না, তা জানা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঘোষণা করা। কাস্টমসের নিয়ম মেনে শুল্কযোগ্য পণ্য ঘোষণা করলে পরবর্তী প্রক্রিয়া অনেক বেশি পরিষ্কার থাকে।

বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করার আগে সর্বশেষ নিয়ম কেন যাচাই করবেন?

শুল্ক ও ব্যাগেজের নিয়ম স্থায়ীভাবে একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন SRO, বাজেট সিদ্ধান্ত বা বিধিমালা জারি করতে পারে। NBR-এর নিজস্ব তথ্যভাণ্ডারেও বিভিন্ন বছরের ব্যাগেজ বিধিমালা আলাদাভাবে প্রকাশ করা রয়েছে।

বর্তমানে ২০২৫ সালের অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা তালিকাভুক্ত রয়েছে। তাই কয়েক বছর আগে প্রকাশিত কোনো Facebook পোস্ট বা পুরোনো ব্লগের তথ্য দেখে সোনা আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

বিশেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকলে যাত্রার আগে NBR বা বাংলাদেশ কাস্টমসের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া ভালো।

সংক্ষেপে বিদেশ থেকে সোনা আনার বর্তমান নিয়ম

বিদেশ থেকে ব্যক্তিগত যাত্রী হিসেবে সোনা আনতে চাইলে বিষয়টি মোটামুটি এভাবে বোঝা যায়।

  • সোনার গহনা: সর্বোচ্চ ১০০ গ্রাম পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক-করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। একই ধরনের গহনা ১২টির বেশি হওয়া যাবে না।
  • সোনার বার: সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তে আনা যায় এবং প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম বা ১ ভরিতে ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়।
  • ১০ ভরি বা প্রায় ১১৭ গ্রাম: মোট শুল্ক প্রায় ৫০,০০০ টাকা।
  • বাণিজ্যিক Unwrought Gold: HS Code 7108.12.90-এর ক্ষেত্রে প্রকাশিত ২০২৫-২০২৬ Customs Tariff-এ প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ২,০০০ টাকা Customs Duty দেখানো হয়েছে।
  • Semi-Manufactured Gold: HS Code 7108.13.00-এর ক্ষেত্রে একই ট্যারিফে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ২,০০০ টাকা Customs Duty দেখানো হয়েছে।
  • Gold Dore: HS Code 7108.12.10-এর ক্ষেত্রে প্রকাশিত ট্যারিফে ১০% Customs Duty দেখানো হয়েছে।

FAQ: বিদেশ থেকে সোনা আমদানি ও শুল্ক

বিদেশ থেকে ১ ভরি সোনার বার আনলে কত শুল্ক দিতে হয়?

বর্তমান যাত্রী ব্যাগেজ নিয়ম অনুযায়ী ১ ভরি বা ১১.৬৬৪ গ্রাম সোনার বারের জন্য ৫,০০০ টাকা শুল্ক দিতে হয়।

১০ ভরি সোনার বারের শুল্ক কত?

১০ ভরি সোনার জন্য প্রতি ভরি ৫,০০০ টাকা হিসাবে মোট শুল্ক ৫০,০০০ টাকা।

বিদেশ থেকে ১০০ গ্রাম সোনার গহনা আনলে কি শুল্ক দিতে হবে?

নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত সোনার গহনা শুল্ক ও করমুক্ত আনার সুবিধা রয়েছে। একই ধরনের গহনা ১২টির বেশি হওয়া যাবে না।

বছরে কয়বার সোনার বার আনা যায়?

বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সুবিধায় বছরে একবার সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি সোনার বার আনা যায়।

১১৭ গ্রামের বেশি সোনার বার আনা যাবে?

১১৭ গ্রামের বেশি সোনা যাত্রী ব্যাগেজের এই নির্দিষ্ট সুবিধার আওতায় পড়ে না। কাস্টমসের নির্দেশনায় সীমার অতিরিক্ত সোনা আটক বা জব্দ করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।

ব্যবসায়িকভাবে সোনা আমদানি করলে কি প্রতি ভরিতে ৫,০০০ টাকা দিতে হবে?

না। ৫,০০০ টাকা প্রতি ভরি হলো নির্দিষ্ট যাত্রী ব্যাগেজ সুবিধার শুল্ক। বাণিজ্যিক আমদানির ক্ষেত্রে সোনার ধরন ও HS Code অনুযায়ী Customs Tariff প্রযোজ্য হয়।

বিদেশ থেকে সোনা এনে কাস্টমসকে জানানো কি বাধ্যতামূলক?

শুল্কযোগ্য সোনা বা নির্ধারিত সীমার বাইরে কোনো পণ্য থাকলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী কাস্টমসকে ঘোষণা করতে হয়। বিশেষ করে সোনার বার ঘোষণা ছাড়া বহন করা আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শেষ কথা

বিদেশ থেকে সোনা বাংলাদেশে আনার নিয়মকে এক কথায় বোঝাতে গেলে বলা যায়—সোনার ধরন, পরিমাণ এবং আমদানির উদ্দেশ্য অনুযায়ী শুল্ক ও নিয়ম পরিবর্তিত হয়।

ব্যক্তিগত যাত্রী হিসেবে বিদেশ থেকে সোনার গহনা আনলে নির্দিষ্ট শর্তে ১০০ গ্রাম পর্যন্ত শুল্ক-করমুক্ত সুবিধা রয়েছে। আর সোনার বার বা পিণ্ডের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ ভরি পর্যন্ত নির্ধারিত শুল্ক দিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রাম বা ১ ভরিতে শুল্ক ৫,০০০ টাকা হওয়ায় ১০ ভরি সোনার বারের জন্য মোট শুল্ক প্রায় ৫০,০০০ টাকা।

অন্যদিকে ব্যবসায়িকভাবে সোনা আমদানি করলে বিষয়টি আরও আলাদা। NBR-এর প্রকাশিত Customs Tariff-এ Gold-এর বিভিন্ন form-এর জন্য আলাদা HS Code এবং আলাদা শুল্কহার রয়েছে। যেমন কিছু Unwrought Gold ও Semi-Manufactured Gold-এর ক্ষেত্রে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামে ২,০০০ টাকা Customs Duty এবং Gold Dore-এর ক্ষেত্রে ১০% Customs Duty দেখানো হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরোনো কোনো তথ্যের ওপর নির্ভর না করে সোনা আনার ঠিক আগে সর্বশেষ NBR ও বাংলাদেশ কাস্টমসের নিয়ম যাচাই করা। কারণ ব্যাগেজ বিধিমালা, শুল্কহার বা আমদানি সংক্রান্ত নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে।

সোনা যেহেতু অত্যন্ত মূল্যবান একটি পণ্য, তাই কয়েক হাজার টাকা বাঁচানোর জন্য নিয়ম ভঙ্গ করার ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে সঠিক ঘোষণা, সঠিক শুল্ক পরিশোধ এবং বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই নিরাপদ।

Scroll to Top